সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, রাজধানীর মগবাজারের একটি বহুতল ভবনে নরম জেলি ও রাসায়নিক কেমিক্যাল মিশিয়ে প্লাস্টিকের নকল ডিম তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ এবং তাদের তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এমন দাবিতে প্রচারিত কয়েকটি ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
প্রচারিত ছবিতে একটি গুদামঘর বা কারখানার মতো স্থানে র্যাক ও মেঝেজুড়ে বিপুলসংখ্যক সাদা ডিম বা ডিমসদৃশ বস্তু দেখা যায়। ছবিতে তিন ব্যক্তিকে হাত বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে বসিয়ে রাখা এবং তাদের পেছনে বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক পরা তিনজন সদস্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সামনে বিভিন্ন রঙের তরলভর্তি বাটি ও বাংলায় ‘রাসায়নিক পদার্থ’ লেখা একটি বোতলও দেখা যায়।
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, মগবাজারে নকল ডিম তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটকের দাবিটি সম্পূর্ণ অসত্য। এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের মূলধারার কোনো গণমাধ্যমেও মগবাজার বা ৩০০ ফিট এলাকায় নকল ডিম তৈরির কারখানায় পুলিশি অভিযান, তিনজনকে আটকের ঘটনা কিংবা কারখানা সিলগালা করার বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
এ ছাড়া প্রচারিত ছবিটি বাস্তব কোনো অভিযান বা কারখানার ছবি নয়; এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তৈরি। এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল Hive Moderation ছবিটিকে ৯৯ শতাংশ সম্ভাবনায় এআই-জেনারেটেড হিসেবে শনাক্ত করেছে। একইভাবে গুগলের SynthID প্রযুক্তিও ছবিটির আংশিক বা সম্পূর্ণ অংশ গুগলের এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত হওয়ার সম্ভাবনা শনাক্ত করেছে।
‘প্লাস্টিক ডিম’ নিয়ে পুরোনো বিভ্রান্তি:
বাজারে প্লাস্টিক বা নকল ডিম পাওয়া যায়, এমন ধারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। বিভিন্ন সময়ে আসল ডিমকে নকল বা প্লাস্টিকের ডিম দাবি করে ছবি ও ভিডিওও ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ধরনের দাবির পক্ষে প্রায়ই ২০১৭ সালে সময় টিভিতে প্রচারিত ‘হাতেনাতে ধরা পড়লো কৃত্রিম চাইনিজ ডিম’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কলকাতার পার্ক সার্কাস বাজারে অনিতা কুমার নামের এক ক্রেতার অভিযোগের ভিত্তিতে ‘প্লাস্টিক ডিম’ বিক্রির অভিযোগে মোহাম্মদ শামীম আনসারী নামের এক ডিম বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে পরবর্তীতে প্রকাশিত একাধিক ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, ওই ডিমগুলো প্লাস্টিকের ছিল না। পরীক্ষাগারেও ডিমগুলোতে কোনো কৃত্রিম বা প্লাস্টিকজাত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার করা ডিমের নমুনা পশ্চিমবঙ্গের অ্যানিমেল অ্যান্ড ফিশারি সায়েন্স ইউনিভার্সিটি এবং সরকারি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, দীর্ঘ সময় ধরে কোল্ড স্টোরেজে বা ফ্রিজে ডিম অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় রাখলে অথবা ডিমের ভেতরের পাতলা পর্দা (Membrane) শুকিয়ে গেলে তা শক্ত ও প্লাস্টিকের মতো চামড়া হয়ে যায়। আগুনে ধরলে সেই শুকিয়ে যাওয়া পর্দাটি পুড়তে শুরু করে। সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানের এই বিষয়টি না বুঝে আতঙ্কিত হয়ে পুলিশের কাছে "প্লাস্টিক ডিম" বলে অভিযোগ করেছিলেন।
পরীক্ষাগারে সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর ওই বিক্রেতাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (FSSAI) দেশবাসীকে নিশ্চিত করে যে, "প্লাস্টিক ডিম" বা "নকল ডিম" বলতে বাজারে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, এটি সম্পূর্ণ একটি অমূলক আতঙ্ক বা গুজব।
বাংলাদেশেও নকল ডিম নিয়ে বিভ্রান্তি:
বাংলাদেশে নকল বা কৃত্রিম ডিম নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়ে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে নকল ডিমের উপস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও তদন্তের পর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়েছে যে এসব প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য ও মতামত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা যথাযথ তথ্যপ্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়। তদন্তে বাংলাদেশের কোথাও নকল বা কৃত্রিম ডিমের উপস্থিতির প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নকল ডিম তৈরির দাবি করে যেসব ভিডিও মাঝেমধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলোর অনেকগুলো যাচাই করে দেখা যায় সেগুলো আসলে খেলনা বা ডিমসদৃশ বস্তু তৈরির ভিডিও। আবার কিছু ভিডিওতে দেখানো বস্তু পচা, নষ্ট বা অস্বাভাবিকভাবে জমাট বাঁধা ডিম, যেগুলোকে ভুলভাবে ‘প্লাস্টিক ডিম’ হিসেবে প্রচার করা হয়।
রাসায়নিক ব্যবহার, খাদ্য সংরক্ষণ বা ডিমের স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকেও এ ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মগবাজারে নকল ডিম তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক ও তিন লাখ টাকা জরিমানার দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রচারিত ছবিটিও বাস্তব ঘটনার ছবি নয়, এটি এআই দিয়ে তৈরি।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, বাজারে ‘প্লাস্টিক’ বা ‘কৃত্রিম ডিম’ থাকার দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই মগবাজারে নকল ডিম তৈরির কারখানার দাবিটি একটি ভিত্তিহীন গুজব।